বাস্তু শাস্ত্র ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি
 
মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এ সবের জন্যেই পৃথিবীর বায়ুমন্ডল বা সমুদ্রে এবং নদীতে তৈরি হচ্ছে ঢেউ। প্রাণিজগতের ওপরও এই সমস্ত প্রভাব সদাসর্বদাই পড়ছে। জীবনের ওপর প্রভাব, বিশেষ করে মানবজীবনের ওপর প্রভাব নিয়েই জ্যোতিষশাস্ত্র বা জ্যোতির্বিজ্ঞান গড়ে উঠেছে। জ্যোতিষশাস্ত্র সূর্য, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি, রাহু, কেতু ইত্যাদি গ্রহের এবং রাশির সঙ্গে সম্পর্কিত। গ্রহনক্ষত্র এবং রাশিচক্র পৃথিবীর জীবনের ওপর প্রভাবিত। আকাশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল শব্দ।

আমরা জানি যে পৃথিবী নিজেই একটি বৃহৎ চুম্বক। চুম্বকের ধর্ম হল তাকে যদি খণ্ড খণ্ড করে হাজার টুকরো করা যায় তবে প্রতিটি খণ্ডই একটি চুম্বকে পরিণত হয় যাতে চুম্বকীয় ধর্মগুলি বিদ্যমান থাকে। অনুরূপে সমগ্র পৃথিবীকে শত-সহস্র খণ্ডে বিভক্ত করলে প্রতিটি খণ্ডেই চুম্বকীয় ধর্ম থাকবে। তাই একটি বিশাল আকারের জমি হোক বা অতি ক্ষুদ্র প্লটই হোক, প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতিটি জমিতে থাকবে চুম্বকের গুণাবলি।

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি বস্তু থেকেই যার যার নিজস্ব তরঙ্গে প্রতিনিয়ত শক্তি বিকিরণ হয়। কেবলমাত্র কঠিন, তরল, গ্যাসের থেকেই নয়, প্রতিটি অণু, তন্তু ও কোষ থেকেও শক্তি বিকিরিত হয়। কিছু বস্তু থেকে বিকিরিত হয় ধনাত্মক শক্তি, আবার কিছু থেকে ঋণাত্মক শক্তি। যে সমস্ত বস্তু থেকে ধনাত্মক শক্তি বিকিরিত হয় সেগুলি উপকারী । আর যে সমস্তু বস্তু থেকে ঋণাত্মক শক্তি বিকিরণ হয় সেগুলি ক্ষতিকর। বস্তু থেকে বিকিরিত ক্ষতিকর ঋণাত্মক শক্তিকে কেমনভাবে প্রতিহত করা যায় তারও নির্দেশ আছে বাস'শাস্ত্রে। সেটিই বাস্তুকলা। আমাদের চারপাশে যে সমস্ত বস্তু বিরাজ করে তার মধ্যে বেশ কিছু ধনাত্মক শক্তিসম্পন্ন এবং বেশ কিছুর রয়েছে ঋণাত্মক শক্তি। আমি পূর্বেই বলেছি ঋণাত্মক শক্তিসম্পন্ন বস্তু ক্ষতিকারক। কাজেই এই ঋণাত্মক শক্তিসম্পন্ন বস্তু গুলিকে পরিহার করে চলা উচিত। ধনাত্মক শক্তিসম্পন্ন বস্তুর উদাহরণ হল- পিতল, ক্রিস্টাল, চিনামাটি, সিরামিক, বেশ কিছু পাথর, সুরকি, কাঠ, গাছপালা ইত্যাদি। আর ঋণাত্মক বস্তুসকল হল লোহা, অ্যাক্রিলিক, পলিতিন, নাইলন, পিভিসি, সিন্থেটিক ভিনাইল, গ্রানাইট ইত্যাদি। এই ঋণাত্মক বস্তু সকল পরিহার করলে ভাল। আর ধনাত্মক বস্তু সকল জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই উপকারী। ঋণাত্মক শক্তি সিরোটিনিন ও হিস্টামাইন উৎপন্নণ করে মানবদেহে। যার ফলে অসুস্থতা সৃষ্টি হয় এবং জীবনীশক্তি কমিয়ে দিয়ে হতাশা বাড়ায়।

বাড়ির নকশা করার সময় বাতাসের গতিবেগের কথা মাথায় রাখা অবশ্য প্রয়োজনীয় কেননা বাতাসের গতিবেগ ও দিকনির্দেশ নির্ভর করে সূর্যের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের উপর। তাই চেরাপুঞ্জি প্রবাহিত হাওয়ার গতিবেগ ও সাহারা মরুভূমি অঞ্চলের হাওয়ার গতিবেগ এক নয়। চেরাপুঞ্জির বাতাসের গতিবেগ পর্বত উপকূলবর্তী বলে অনেক বেশি। আর বৃষ্টিও বেশি। তাই চেরাপুঞ্জির বাড়ির ছাদ ঢালু করা হয়। সমগ্র সাহারা অঞ্চলে এর বিপরীত চিত্র। ছাদের তল করা হয় সমতল।

সূর্যকিরণ সারাদিন ধরে পাই, রাতে পাই না। কিন্তু মহাজাগতিক রশ্মি ২৪ ঘণ্টা ধরেই চলে। অথচ খালি চোখে তা দৃশ্যমান নয়। এই মহাজাগতিক রশ্মিকে বাস্তু পরিকল্পনার সাহায্যে একত্রিত করে মানবজীবনের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়। মজার কথা হল বাস'শাস্ত্রে জমি-বাড়ির সকল ত্রুটি থেকে মুক্তির উপায়ও বলা আছে। আর সেই উপায় খোঁজা যায় অভিজ্ঞ বাস্তুশাস্ত্রীর মাধ্যমে। বাস্তু শুধু কোন দেশের নির্দিষ্ট স্থাপত্যবিদ্যা নয়, আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত শাস্ত্র।

 
বলা বাহুল্য, বাস্তুশাস্ত্র শিল্প, বিজ্ঞান, গ্রহবিজ্ঞান, জ্যোতিষশাস্ত্র এবং অতীন্দ্রিয়বাদেরই সমন্বয়। মানব সমাজের উপর প্রভাব বিস্তারকারী অন্যান্য বিষয় যেমন আবহাওয়া, তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, বাতাসের গতি ও অভিমুখ, রৌদ্রালোক, আদ্রতা, তেজস্ক্রিয়তা, সময়, মহাশূন্য এবং বাসস্তুস্থানের চর্চার অপর নাম বাস্তুশাস্ত্র। হিন্দু শাস্ত্রে এই মহাজাগতিক শক্তিপুঞ্জকে ‘মহাভূত’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এই কম্পন এবং পৃথিবীর পঞ্চতত্ত্বই (ক্ষিতি, অপু, তেজ, মরুৎ, ব্যোম) বিভিন্ন মহাজাগতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জন্য দায়ী। এইগুলি মানব সমাজের কল্যাণে ব্যবহার করাই বাস্তুশাস্ত্রের লক্ষ্য।


 
Warning: Any unauthorised use or reproduction of rajeshshori.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes
    copyright infringement liable to legal action.