বৃক্ষ, বন বাগান
 

বৃক্ষ ও বন আমাদের কত বন্ধু তা আর বলার অবকাশ রাখে না । যুগ যুগ ধরে মানুষ গাছপালা উপকারিতা বুঝেছে। বৃক্ষ সমৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করে । নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে এ কথা আরও বেশি সত্য বলে পরিচিত । মানুষ গাছপালা ছাড়া বাঁচতে পারেনা। গাছের কাছ থেকে মানুষ শুধু দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা গুলি আদায় করে নিয়ে চলেছে । যেমন বাড়িঘরের জন্য আসবাপত্রের জন্য, যন্ত্র পাতি তৈরির জন্য, গ্রামে জ্বালানির জন্য কাঠের দরকার । আবার ফুল-ফল ও ছায়া তাও এই গাছ থেকেই পাওয়া যায় । এ সব তো আছেই তা ছাড়াও বিভিন্ন উপায়ে আমরা গাছের সাহায্য নিয়ে থাকি । তাই আমাদের জীবনে গাছ অতি গুরুত্বপূর্ণ । জলবায়ুর তীক্ষ্ণতাকে উপশম, মাটি সংরক্ষণ- এ ছাড়া পানির সংগ্রহ বজায় রাখতে গাছ সাহায্য করে। বৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ, শীত গ্রীষ্মকে অনুকুল রাখা এবং বাতাস ও পানির বেগকে আটকে দিয়ে ভূমিক্ষয় রোধ করে গাছ পালা ও জঙ্গল । প্রাচীন গ্রন' গাছ সম্পর্কে বলা হয়েছে , যে মানুষ রাস্তার ধারে এবং জলাশয়ের পাশে গাছ লাগায় সে বেহেশ্‌তে ততদিন খুব আনন্দে থকবে যতদিন ওই বৃক্ষটি ফলবতী থাকবে ।
গাছ নিজের মাথায় গরম সহ্য করে নেয়, কিন্তু নিজের ছায়া দিয়ে অন্যদের গরম থেকে রক্ষা করে । এইটিই হল গাছের বিশেষত্ব।

বৃক্ষ নিজের পাতা, পুল, ফল ,ছায়া, বল্কল, কাষ্ঠ, গন্ধ, ভস্ম, আঁটি ও কোমল অঙ্কুর দিয়ে সকল প্রাণীকে সুখ দেয়। ১ হেক্টর এলাকার গাছপালা ৩ মেট্রিক টন বায়ু গ্রহণ করে ২ মেট্রিক টন বিশুদ্ধ অক্রিজেন প্রদান করে । মানুষের জীবনে গাছপালা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সঙ্গী । শৈশবে দোলনা ও খেলনা রূপে যে বৃক্ষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের শুরু, তারপর স্কুল-কলেজ ও অফিসের চেয়ার -টেবিল, বিবাহিত জীবনের আসবাবপত্র, বৃদ্ধাবস্থায় লাঠি ও মৃত্যুর পর কবর, সর্বত্রই গাছ আমাদের পরম সঙ্গী।

বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে বৃক্ষরোণের পরম্পরা প্রচীনকাল থেকে চলে আসছে। আমাদের সংস্কৃতি ধর্ম নিরপেক্ষ। শাস্ত্রে বৃক্ষের যত্নের বিধান আছে। বাস্তুশাস্ত্রে বসবাসের স্থানে গাছ লাগানো,বন-উদ্যান ও বাগান করাকে শুভ বলা হয়েছে। এই গাছপালার লালনপালন কোনও রকমের জাতিগত ভিত্তিতে করা হয় না। বিশুদ্ধ বায়ু শুধু স্বাস্থ্যই নয়, সব দিক্‌ থেকে, লাভজনক। গাছ দুষণের হাত থেকে জীবজগৎকে রক্ষা করে। এই গাছপালা কমে যাওয়ার ফলে দুষণের পরিমাণ বৃদ্ধি হচ্ছে। বৃষ্টি হচ্ছে কম। এর ফলে দেখা দিচ্ছে নানা রকম রোগ। নিঃশ্বাসের কষ্ট বৃদ্ধি, নানা জটিল রোগ দেখা দিচ্ছে। তাই মানুষ এখন শহর ছেড়ে গ্রামের মতো পরিবেশে ফিরে যেতে চাইছে। শহরে কংক্রিটের জঙ্গলময় পরিবেশকে কিছুটা দূষণ মুক্ত করার জন্য গাছপালা লাগানো অত্যন্ত জরুরী ।

সনাতন ভারতীয় শাস্ত্রে অরণ্য বৃক্ষের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। মানব-জীবনে মানুষ চারটি অস্থায় চার ধরনের কর্মে রত থাকে- ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রসস্থ ও সন্ন্যাস। বানপ্রসস্থ আর সন্ন্যাস জীবনে অরণ্যেও সন্তান অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। তীর্থভ্রমন সর্ম্পকে বলা হয়েছে, দ্বাদশ অরণ্য পরিভ্রমণে তীর্থের পূণ্যফল লাভ হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে দ্বাদশ অরণ্যের কথা বলা দরকার ।

 
তুলসী গাছ :
 

গৃহস্থাশ্রমের অন্যতম পবিত্র গাছ হল- তুলসী। এই গাছের উৎকৃষ্ট ওষুধ বা ভেষজের গুনাবলী আছে। এর ডাল, পাতা দিয়ে বহু ওষুধ তৈরি হয়। প্রতিদিন সকালের সময় দুটি তুলসী পাতা পানিতে রেখে সে পবিত্র পানি পান করলে কোনও রকমের রোগ হয় না । চর্ম রোগে তুলসী পাতা আশ্চার্যজনক ভাবে কাজ করে । তুলসির বাতাসে নানা রোগ সারে। এর রস ফুলফুসকে নীরোগ রাখে। পাতা চর্বণে মুখের দুর্গন্ধ নাশ হয়।

তুলসী গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে আক্সিজেন দেয়। প্রতি বাড়িতে অন্তত দুটি তুলসী গাছ লাগানো উচিৎ। এতে বাড়ির সকলের স্বাস্থ্য ভাল থাকে। দুষণ রোধে তুলসী অতুলনীয়। এতে মানুষের জীবনীশক্তি বৃদ্ধি হয়। রোগ দূরে থাকে। তুলসীর গন্ধবাহী বায়ু যে দিকেই অর্থাৎ দশদিকে যাক না কেন সবদিক সে বায়ু দুষণমুক্ত করে। শুধু তাই নয়, পৃথিবীতে যে চার প্রকার প্রাণী- অন্ডজ পিন্ডজ, জরায়ুজ ও উদ্ভিজ্জ আছে, প্রত্যেকের পক্ষেই অত্যন্ত উপকারী এই তুলসী গন্ধযুক্ত বায়ু।

প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের উন্নতি মানুষের অগ্রগতিতে সহায়ক হলেও দূষণ সৃষ্টি করে মানুষ জীবনে ক্ষতির কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রমাগত দূষণে বায়ুমণ্ডলের ’ওজোন’ স্তর নষ্ট হচ্ছে। ’ওজোন ’ সূর্যের সরাসিরি অতিবেগুনি রশ্মি থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে চলেছে।

বনসৃজনের মাধ্যমে আমরা দূষণ আটকানোর চেষ্টা করে চলেছি। এক্ষেত্রেও তুলসীর কোনও বিকল্প নেই। অন্যান্য গাছ শুধু দিনেরবেলায় কার্বণ ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন দেয়। রাতের বেলা বিপরীত ক্রিয়ায় অক্সিজেন গ্রহণ করে কার্বণ ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে। কিন্তু তুলসী দিন ও রাতে সর্বদাই অক্সিজেন দেয়। অন্যান্য গাছের এই ক্ষমতা নেই। বৃক্ষ আয়ুর্বেদ সম্পর্কে ঋষি ‘চরক’ বলেছেন, বাড়ির পূর্ব দিকে অশ্বত্থ, দক্ষিণে পাকুড়, পশ্চিমে বট ও উত্তর দিকে উদুম্বরের গাছ লাগাবেন না।

গৃহের পুর্বদিকে অশ্বত্থ গাছ থাকলে অগ্নিভয় হয়। দক্ষিণে পাকুড় গাছ থাকলে পিত্ত বৃদ্ধি হয়। পশ্চিমে বট বৃক্ষ থাকলে রাজপীড়া হয় এবং বাড়ির উত্তরে ডুমুর গাছ থাকলে উদরাময় রোগ হয়। সুপারি, শ্রীফল, নারিকেল (ঝুনো), লবণী (লবণাক্ত), জাম, কাঁঠাল, আম, ডালিম, কমলালেবু, লেবু, মধুপর্ণী, কলা, শিরীষ, আমলকী, জাতি, চাঁপা, মল্লিকা, বকুল, সজনে, পাটল, দেবদারু, অশোক, জয়ন্তী ও টগর ইত্যাদি গাছ বাড়ি ঘরে লাগালে সমৃদ্ধি ঘটে। জ্যোতিষতত্ত্বে বলা হয়েছে যে, জাম, সুপারি, কাঁঠাল, আম, কেতকী, জাতি, পদ্ম, টগর, দারুচিনি,মল্লিকা, নারকেল,কলা ও পটল ইত্যাদি গাছপালা যদি বাড়ি ঘরে লাগানো হয় তা হলে সে বাড়িতে ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ থাকে।

জ্যোতিষতত্ত্ব অনুসারে দাড়িম্ব, অশোক, পু্‌ন্নাগ, বিল্ব ও কেশরের গাছ বাড়িঘরে লাগানো মঙ্গলজনক। রক্ত পুষ্প গাছ লাগালে রাজভয় হয়। আর শাল্মলী গাছ লাগালে হয় গৃহবিচ্ছেদ। যে সব গাছ বাড়িতে লাগানো উচিৎ নয় সে গুলি হলো- নিম, পলাশ, খেজুর, জাম, সরল, তেতুল, কাঞ্চন, স্থুল শিম্ব, বহেরা, ধুতরো, হরীতকি, সপ্তপর্ণী ও মনসা, এই সব গাছ লাগালে ক্ষতি হয়।

 
 
Warning: Any unauthorised use or reproduction of rajeshshori.com content for commercial purposes is strictly prohibited and constitutes
    copyright infringement liable to legal action.